মুক্তির সন্ধানে…
ইলিয়াস মশহুদ :
‘সত্যের মৃত্যু নেই’ কথাটি চিরবাস্তব। চির সত্য। সর্বজন বিধিত।
সর্বস্বীকৃত। সত্য সুন্দর, তৌহিত্ববাদের লয় নেই, ক্ষয় নেই, নেই পরাজয়।
সত্যের গৌণতা ঘটতেই পারে, তবে সত্য চিরদিন চাপা পড়ে থাকে না। মিথ্যার জয়
ক্ষণিকের। অসত্যের দাপট ক্ষণস্থায়ী। এ যেনো মাকড়সার জাল। ধু-ধু মরুর
বিস্তীর্ণ প্রান্তর। নেই কোথাও জনমানবের বিচরণ। আছে শুধু বালুকারাশির
চিকচিক কণা। সমুদ্রের মতো বিশাল বিশাল ঢেউ। এগুলাম সামনে। আশাহত হলাম।
ছিটিয়ে দেয়া হলো আশার গুড়েবালি। শুরু করলাম হা-হুতাশ। বিশ্ব বিধাতার বিধান
‘নিশ্চয়ই মিথ্যার অপনোদন আবশ্যম্ভাবী।’ মনকে প্রবোধ দিলাম। শান্ত্বনার
বাণী শুনালাম। পাহাড়সম ধৈর্যের মাধ্যমে অপেক্ষার প্রহর গুণতে লাগলাম- দেখা
যাক কী হয়।
সময়টা
খিস্টীয় পঞ্চম শতকের শেষ দিক। আরব অনারব সর্বত্রই মিথ্যা আর দাম্ভিকতার
জোয়ার। অসভ্যতার সয়লাব। নির্মমতা আর নিষ্ঠুরতার স্বর্ণ (?) কাল। সুদ-ঘুষ
আর পেশিশক্তির জয়জয়কার। অন্ধতা আর ভ্রষ্টতার বিজন মরুতে নিমজ্জিত সমগ্র
জাহান। সত্যের নেই কোনো লেশ। আছে শুধু পেশিশক্তির জেদ। আছে তীর ধনুক আর
নাঙ্গা তরবারি নিয়ে রক্তের হোলিখেলা। আলোর সন্ধান দেবার জন্য নেই কোনো
মহাত্মা। নেই সত্যের দিশারী মর্দে মুজাহিদ জাগতিক কোনো নেতা। আছে শুধু
উচ্ছৃঙ্খলতা আর লাম্পট্যপনা।
আর
ঠিক তখনই, আঁধারে নিমজ্জিত সমগ্র বিশ্বকে, উচ্ছৃঙ্খলতা আর বর্বরতার
জোয়ারে ভাসতে থাকা আরব জাহানকে অন্ধকারের বিজন মরু থেকে উদ্ধার করতে,
অন্ধকার দূরীভূত করে আলোর মশাল জ্বালাতে, মানবতা-মনুষ্যত্যের শিক্ষা দিতে,
প্রকৃত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে, বিশ্ব মানবতার মুক্তির সন্ধান দিতে
‘রাহমাতে আলম’ হিসেবে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের শেষ দিকে মৃন্ময়ী মেদেনীর বুক
চিরে আরবের বিখ্যাত কুরাইশ বংশে শুভাগমন করেন সৃষ্টিজীবের সর্বশ্রেষ্ঠ
মহামানব, পেয়ারা নবী, দু’জাহানের সরদার, তাজদারে মদীনা মুহাম্মাদুর
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যে মহামানবের সৃষ্টি না হলে
কোনো কিছুরই সৃষ্টি হত না, যার পদচারণায় ধূলিকণা থেকে শুরু করে পৃথিবীর
বুকে যা কিছু আছে ধন্য হয়েছে সবই।
আল্লাহর
প্রতি অগাধ বিশ্বাস, ভালোবাসা, অন্তরের পবিত্রতা, ধৈর্য, মহত্ব, ক্ষমা,
ভদ্রতা, নম্রতা, বদান্যতা, শিষ্টাচার, উত্তম স্বভাব, আমানতদারি,
ন্যায়পরায়ণতা উদারতা, কর্তব্যনিষ্ঠা ছিল যার সম্বল। যিনি ছিলেন এতিম হিসেবে
স্নেহের পাত্র, স্বামী হিসেবে প্রেমময়, পিতা হিসেবে মায়াময়, সাথী হিসেবে
বিশ্বস্ত। যিনি ছিলেন সফল ব্যবসায়ী, সমাজ সংস্কারক, বিচারের মঞ্চে
ন্যায়বিচারক, মহৎ রাজনৈতিক, সফল রাষ্ট্রনায়ক, যুদ্ধের ময়দানে লড়াকু যোদ্ধা।
তিনি হলেন বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত সর্বশ্রেষ্ঠ মহানমানব হযরত মুহাম্মদ
সা.।
তিনি
যে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব! একথা যুক্তি প্রমাণের মাধ্যমে উল্লেখ
করার প্রয়োজন নেই; বরং সভ্য পৃথিবীর অমুসলিমরা পর্যন্ত এ সত্য স্বীকারে
বাধ্য হয়েছে যে, তিনি হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। যেমনিভাবে ঐতিহাসিক,
খ্রিস্টান লেখক উইলিয়াম মুর বলেছেন, ‘হযরত মুহাম্মদ সা. কে শুধু সে যুগেরই
একজন মনীষী বলা যাবে না; বরং তিনি ছিলেন সর্বকালের, সর্বযুগের, সর্বশ্রেষ্ঠ
মনীষী।’ শুধু উইলিয়াম মুরই কেন? এই মাটির পৃথিবীতে জ্ঞানের জগতে পদচিহ্ন
রেখে যাওয়া প্রায় সকলেই বিশ্বনবী সা. সম্পর্কে এ ধরনের সুচিন্তিত মতামত
রেখে গেছেন।
আমরা
সকলেই জানি, নবী করীম সা. এমন এক ক্রান্তিকালে এই পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন,
যেটাকে পরবর্তীকালের ঐতিহাসিকগণ ‘আইয়ামে জাহেলিয়্যাত’ বা মূর্খতার যুগ
হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু মাত্র তেইশ বছরের নবুওতী জীবনে আল্লাহর
নির্দেশিত পথ ও পদ্ধতিতে ইসলাম নামের শাশ্বত এ জীবন বিধানকে এমনভাবে বিজয়ী
করে তুললেন যে, সমকালীন বিশ্বের সত্যান্বেষী মহল, তখন ইসলামের কাছে
আত্মসমর্পণ না করে আর থাকতে পারল না। ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ
করে সাহাবির মর্যাদা পেলো। পেয়ে গেলো দুনিয়া ও আখেরাতের পূর্ণ মর্যাদার
গ্যারান্টি। যাক, স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা যার গুণকীর্তন করেছেন পবিত্র কুরআনের
অসংখ্য জায়গায়। যাকে আল্লাহ তায়ালা ‘সারা জাহানের রাহমাত’ বলে আখ্যায়িত
করেছেন। সমগ্র মানবজাতির জন্যে ‘শুভসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী’ বলেছেন।
যার জীবন মানুষের জন্য উত্তম আদর্শ, বা উস্ওয়াতুন হাসানা বলে উল্লেখ
করেছেন। যাকে এই বলে মর্যাদার উচ্চাসনে আসীন করেছেন যে- ‘আমি তো তোমাকে
দিয়েছি কাউসার, উন্নত চরিত্র, অনুপম সৌন্দর্য, বংশাভিজাত্য, আর পূর্ণ
সফলতা’। এমনকি তার আবাসভূমি সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি এই শহরের শপথ করে বলছি,
যে শহরে আপনি থাকেন।’
বিশ্ববিধাতা
যার উজ্জ্বল জীবন সৌন্দর্যের অতুলনীয় প্রশংসা করেছেন, তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব কী
আর লিখে শেষ করা যায়? যাঁর নূরানী অস্তিত্বের ছোঁয়ায় মৃতপ্রায় সভ্যতা
নতুনভাবে জীবন লাভ করেছে। জংধরা জাহিলিয়্যাতের অমানিশা বিদূরিত হয়েছে।
পথহারা পথিক পেয়েছে পথের সন্ধান। মানবতা পেয়েছে সঠিক দিশা। একলাখ বা দুইলাখ
২৪ হাজার আম্বিয়ায়ে কেরামের রোপিত আদর্শের বীজবৃক্ষ নবযৌবনে জেগে উঠেছিল;
সেই মহামানবের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করার ভাষাই বা কার আছে?
অতএব,
হাজারো খেয়ালিপনা আর অক্ষমতার ভেতরও এই ভেবে একটু সান্ত্বনা পাই, গর্বিত
হই; আমরা যে উম্মতে মুহাম্মদী! তবে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করার সাধ্য আমার
নেই। ক্ষমতা নেই তাঁর অপরূপ সৌন্দর্য, মর্যাদা, বৈশিষ্ট্য, সফলতা বর্ণনা
করার। তিনিই আমাদের প্রিয় নবী, প্রিয় রাসুল মুহাম্মদ সা.। যাঁর আগমনে থরথর
করে কেঁপে উঠল কাফির বেঈমানদের অন্তরাত্মা। নিভে গেল হাজার বছর ধরে জ্বলতে
থাকা পারস্যের অগি্নশিখা। ভেঙে খান খান হয়ে গেল কায়সার কিসরার শাহী
রাজদরবার। প্রিয় নবী সা. যখন এই ধরাধামে শুভাগমন করলেন, তখন এই শাশ্বত
চিরন্তন বাস্তব সভ্যতা ছিল পেশি শক্তি, অর্থ-দর্প আর বংশীয় মেকী গৌরবের
প্রবল আতংকে ম্রিয়মান। মানব চরিত্রের প্রদীপ ছিল নিষ্প্রভ। সর্বত্রই
বস্তুবাদের ঝড়। প্রভু-মনিবের আসনও দখল করেছিল এই বস্তুবাদ। বস্তুবাদের সেই
প্রচ- চাপে দলিত সমাজ যেনো বসবাসের অনুপযোগী। যেখানে শান্তি নেই,
নিরাপত্তা নেই, সুস্থতা নেই; সেখানকার মানুষেরা ওসব বুঝেও না তখন। নবীজি
আরবের নোংরা অস্বস্তিকর সমাজটাকে ভালো করার কথা ভাবলেন। সমগ্র বিশ্বটাকে
সুন্দর করে ঢেলে সাজাবার কথা ভাবলেন। উপযুক্ত ব্যবস্থাও তিনি গ্রহণ করলেন।
প্রিয় নবীজি দেখলেন, এই সমাজের সমস্যার উৎস একমাত্র এখানকার সমাজের
সদস্যগুলো। এদের ঠিক করা গেলেই সব ঝামেলা চুকে যাবে। কালেমার দাওয়াত দিয়ে
ওদের ঠিক করতে হবে। নবীজি দাওয়াতে এলাহীর ময়দানে অবতরণ করলেন। পৌঁছাতে
লাগলেন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’র বাণী। বিশ্বনবী সা.’র মাধ্যমে দিক-দিগন্তে,
দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ল শান্তি-সম্প্রীতি, ন্যায়নীতি, ঐক্য আর সাম্যর ধর্ম
দ্বীন ইসলামের বাণী। ইসলামের ছায়াতলে অশ্রিত হলো সমগ্র জাহান। ঘোষণা করা
হলো- মুসলমান মুসলমানের ভাই। অন্ধকারের শিকল থেকে বেরিয়ে এলো লাখো জনতা।
কালিমা পড়ে নিবারণ করল ক্ষুধার্ত আত্মার তৃষ্ণা। সারাটা জাহানে বইতে লাগল
শান্তির হিমেল হাওয়া। দ্বীনের মর্দে মুজাহিদরা ইসলামের ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে
বেরিয়ে পড়ল যুদ্ধের ময়দানে। একের পর এক বিজয় পদচুম্বন করতে লাগল তাদের
পদতলে। এগিয়ে যেতে লাগলেন সম্মুখপানে। বেঈমান-মুনাফিকদের অন্তরাত্মা কেঁপে
উঠত তাদের নাম শুনে। বিনা রক্তপাতে বিজিত হলো পবিত্র নগরী
মক্কা-মুয়াজ্জামা। ইসলামের নবী মাওলার পক্ষ থেকে ঘোষণা করলেন, ‘যা আল
হাক্কু ওয়াযাহাকাল বাতিল, ইন্নাল বাতিলা কানা যাহুকা’। সত্য এসেছে মিথ্যা
বিদূরীত হয়েছে, নিশ্চয়ই মিথ্যার অপনোদন আবশ্যম্ভাবী।
সত্যের
বিমলরেখা আর দ্বীনের সিগ্ধ পরশে দলে দলে, ঝাঁকে ঝাঁকে এসে ইসলামগ্রহণ করতে
লাগল দুনিয়াবাসী। ইসলামের হলো জয়জয়কার। সত্যের মাপকাটি হলেন রাসূলের
প্রাণপ্রিয় সাহাবায়ে কেরাম। চির ভাস্বর, চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে সেই সময়কার
মুসলমানদের ইতিহাস।